প্রস্তুতকারক: মোঃ মঞ্জুরুল হক
প্রভাষক (অর্থনীতি)
জিয়াউদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ, কিশোরগঞ্জ
যোগাযোগঃ ০১৭১৫২৪৭৫৮৮
বাজেট হলো একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরের জন্য সরকারের প্রাক্কলিত আয় এবং ব্যয়ের একটি বিস্তারিত হিসাব। এটি মূলত রাষ্ট্রের আর্থিক পরিকল্পনার দলিল।
ফরাসি শব্দ 'Bougette' থেকে বাজেট শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হলো 'টাকার থলি'।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদে বাজেটের কথা উল্লেখ আছে। সংবিধানে একে 'বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি' (Annual Financial Statement) বলা হয়েছে।
অর্থনীতির ছাত্রদের জন্য বাজেটের গুরুত্ব অপরিসীম:
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।
সেই ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট আজ প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা বাংলাদেশের অভাবনীয় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রতীক।
বাংলাদেশের বাজেট মূলত দুইটি প্রধান অংশে বিভক্ত:
সরকার মূলত ৩টি উৎস থেকে আয় করে:
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হলো ভ্যাট। এটি একটি পরোক্ষ কর। আমরা যখন কোনো পণ্য কিনি বা সেবা গ্রহণ করি (যেমন রেস্টুরেন্টে খাওয়া), তখন আমরা ভ্যাট দিই।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু হয়।
এটি একটি প্রত্যক্ষ কর। যাদের বাৎসরিক আয় একটি নির্দিষ্ট সীমার (যেমন ৩,৫০,০০০ টাকা) উপরে, তাদের আয়কর দিতে হয়।
বাজেটের যে অংশ দিয়ে দেশের উন্নয়নমূলক কাজ হয়, তাকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা ADP বলে।
পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, কর্ণফুলী টানেল—সবই এই উন্নয়ন বাজেটের অংশ।
বাংলাদেশে অর্থবছর শুরু হয় ১লা জুলাই এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৩০শে জুন।
যেমন: ২০২৪-২৫ অর্থবছর মানে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কাল।
বাংলাদেশের বাজেট সাধারণত 'ঘাটতি বাজেট' হয়। এর মানে হলো সরকারের আয় কম, কিন্তু ব্যয় বেশি।
উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়নের গতি বাড়ানোর জন্য সহনীয় মাত্রার ঘাটতি বাজেট ভালো (সাধারণত জিডিপির ৫% পর্যন্ত)।
সরকার ঘাটতি মেটাতে দুইভাবে ঋণ নেয়:
বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন।
লক্ষ্য: ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়া হয়। সার, বীজ ও কৃষি যন্ত্রপাতিতে সরকার বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করে।
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ, তাই বাজেটে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল নির্মাণ, ওষুধ সরবরাহ এবং ডাক্তার-নার্স নিয়োগে বাজেট বরাদ্দ থাকে।
কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সরকার বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করে। যেমন:
বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই খাতে যায়।
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং বর্ডার গার্ডদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়। এটি সাধারণত বাজেটের বড় খাতগুলোর একটি।
শিল্পায়ন ও জনজীবনের মানোন্নয়নে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এলএনজি আমদানিতে বাজেটের বিশাল অর্থ ব্যয় হয়।
দেশের চেহারাই বদলে দিচ্ছে মেগা প্রজেক্টগুলো। বাজেট থেকে এগুলোর অর্থায়ন হয়।
সরকার যে দেশি-বিদেশি ঋণ নেয়, তার জন্য প্রতি বছর প্রচুর সুদ দিতে হয়। বর্তমানে বাজেটের ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ২০%) শুধু সুদ পরিশোধেই চলে যায়। এটি অর্থনীতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।
বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকে মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশন নিয়ন্ত্রণে রাখা। বাজারে টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে সরকার দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখার চেষ্টা করে।
প্রতি বাজেটে একটি নির্দিষ্ট জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয় (যেমন ৬.৫% বা ৭%)। এটি নির্দেশ করে দেশের অর্থনীতি গত বছরের তুলনায় কতটা বড় হবে।
বাজেট প্রণয়ন একদিনের কাজ নয়। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রায় ৬ মাস আগে থেকে কাজ শুরু করে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে তাদের চাহিদার তালিকা চাওয়া হয়।
ব্যবসায়ী সংগঠন (যেমন FBCCI), অর্থনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের সাথে অর্থমন্ত্রী প্রাক-বাজেট আলোচনা করেন। তাদের পরামর্শ নিয়ে খসড়া বাজেট তৈরি হয়।
জুন মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতা দেন। অর্থমন্ত্রীর সাথে থাকে তার আইকনিক 'বাজেট ব্রিফকেস'।
সংসদে দীর্ঘ আলোচনার পর, সাংসদদের ভোটে বাজেট পাস হয়। রাষ্ট্রপতি এতে স্বাক্ষর করলে তা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। একে 'অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন অ্যাক্ট' বলে।
বছরের মাঝপথে যদি দেখা যায় বরাদ্দকৃত টাকায় হচ্ছে না বা কোনো খাতে টাকা বেঁচে গেছে, তখন সংশোধিত বা সম্পূরক বাজেট পেশ করা হয়।
সরকারের সকল রাজস্ব আয়, ঋণ এবং ঋণ পরিশোধের অর্থ এই তহবিলে জমা হয়। সংসদের অনুমতি ছাড়া এখান থেকে এক টাকাও খরচ করা যায় না।
সংযুক্ত তহবিল বাদে অন্যান্য অর্থ (যেমন জনগণের সঞ্চয়পত্রের টাকা, প্রভিডেন্ট ফান্ড) এখানে থাকে। সরকার এই টাকার 'ব্যাংকার' বা ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন (১০% এর নিচে)। উন্নত অর্থনীতির জন্য এটি ১৫% এর উপরে হওয়া উচিত। বাজেট বাস্তবায়নে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বাজেটের জন্য ক্ষতিকর। মাঝে মাঝে বাজেটে বিশেষ শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়, যা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় (যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ) সরকার 'ব্যয় সংকোচন' নীতি গ্রহণ করে। যেমন: সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা, নতুন গাড়ি না কেনা।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। এরপর সহজ শর্তে ঋণ বা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না। বাজেট এখন থেকেই সেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের পর এখন লক্ষ্য 'স্মার্ট বাংলাদেশ'। বাজেটে আইসিটি খাত, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ এবং স্টার্ট-আপ তহবিলে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে।
নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাজেটে নারীদের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়। একে জেন্ডার বাজেট বলে। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে এটি চালু আছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের জন্য যে বাজেট বরাদ্দ থাকে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নবায়নযোগ্য শক্তি এর লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক বাজেটের অন্যতম বড় উদ্যোগ 'সর্বজনীন পেনশন স্কিম'। সরকারি চাকরিজীবী ছাড়াও সাধারণ নাগরিকরা যাতে বৃদ্ধ বয়সে সুরক্ষা পায়, তার ব্যবস্থা এটি।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশনগুলোর নিজস্ব বাজেট থাকে, যা জাতীয় বাজেটের অনুদান এবং নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারে বিপুল ভর্তুকি দিতে গিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ে। আইএমএফ-এর শর্ত মেনে সরকার ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা করছে, ফলে জিনিসের দাম বাড়ছে।
বাজেট বাস্তবায়নে ডলার সংকট একটি বড় বাধা। আমদানির বিল মেটাতে রিজার্ভ ভালো থাকা জরুরি। বর্তমানে রিজার্ভ ধরে রাখা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজেট ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। বাংলাদেশে সাধারণত উন্নয়ন বাজেটের (ADP) ৮০-৯০% বাস্তবায়িত হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এর বড় কারণ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃচ্ছ্রসাধনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বাজেট কেন পড়বে? কারণ বাজেট পড়লে তুমি বুঝতে পারবে আগামী এক বছর কোন জিনিসের দাম বাড়তে পারে এবং কোন খাতে চাকরির সুযোগ বাড়বে।
ল্যাপটপ বা কম্পিউটার আমদানিতে শুল্ক কমলে ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধা হয়। আবার শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়লে ছাত্রদের খরচ বাড়ে। তাই বাজেট তোমার জীবনের সাথে জড়িত।
বর্তমানে বাজেটে প্রযুক্তি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ছে। এআই এবং রোবোটিক্স শেখার জন্য সরকার বিভিন্ন প্রজেক্ট নিচ্ছে। ছাত্রদের উচিত এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্কিল ডেভেলপ করা।
বাজেটে এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) ঋণের ব্যবস্থা থাকে। ছাত্ররা পড়াশোনার পাশাপাশি স্টার্ট-আপ বা ই-কমার্স বিজনেস শুরু করতে চাইলে সরকার থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পেতে পারে।
সমালোচকরা বলেন, বাজেটে ধনীরা বেশি সুবিধা পায়। পরোক্ষ কর (ভ্যাট) গরিবের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। একটি কল্যাণমুখী বাজেটে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়া উচিত।
বাজেট শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি একটি জাতির স্বপ্ন পূরণের দলিল। সম্পদ সীমিত, কিন্তু চাহিদা অসীম। এই দুইয়ের সমন্বয় করাই হলো বাজেটের সার্থকতা।
এই বইটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
আশা করি বাংলাদেশের বাজেট সম্পর্কে আপনার ধারণা এখন অনেক স্বচ্ছ।